আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা আর সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দেশের পাম্পগুলোতে তেল নিয়ে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন হাহাকার। বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোলের ওপর নির্ভরশীল মোটরসাইকেল চালকদের জন্য এই সংকট এখন ‘ক্যারিয়ারের মরণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের দিনশেষে টার্গেট পূরণ না হওয়ায় দেখা দিচ্ছে চরম অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলের লাইন দীর্ঘ হতে হতে মাইলের পর মাইল ছাড়িয়ে গেছে। একজন এনজিও কর্মী জানান, “সকালে কিস্তির আদায়ের কাজে বের হওয়ার কথা থাকলেও তেলের জন্য ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। দিনশেষে আমার কালেকশন টার্গেট পূরণ হয়নি। বসদের কাছে এই কৈফিয়ত দেওয়ার কোনো জায়গা নেই। এভাবে চলতে থাকলে চাকরি রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
একই চিত্র বিপণন কর্মকর্তাদের (Marketing Officers) ক্ষেত্রেও। ডিলার ভিজিট ও পণ্য সরবরাহের তদারকি করতে যাদের সারাদিন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটতে হয়, তারা এখন পাম্পের লাইনে বন্দি। একজন বিপণন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে আছে পারফরম্যান্সের ওপর। তেলের অভাবে যথাসময়ে ক্লায়েন্টের কাছে পৌঁছাতে পারছি না। অফিসের জবাবদিহিতা আর ক্যারিয়ারের মহাবিপর্যয় এখন আমাদের চোখের সামনে।”
পাম্পগুলোতে তেল মিললেও তা পাওয়া যাচ্ছে সীমিত পরিসরে। অনেক জায়গায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বারবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে চালকদের। যারা রাইড শেয়ারিং করে সংসার চালান, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে যা আয় হচ্ছে, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে তেলের পেছনে, ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্ববাজারে সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। যদিও সরকার বলছে মজুদ পর্যাপ্ত, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে রেশনিং করছেন।
মোটরসাইকেল এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং লাখো মানুষের রুটি-রুজির প্রধান মাধ্যম। এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে বেসরকারি খাতের বিশাল একটি জনবল মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে
