বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং তার ঘোষণা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গেলে ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল মার্চ মাসের দিনগুলো সামনে চলে আসে। একজন পেশাদার সৈনিক থেকে যেভাবে তিনি রাজনীতির মঞ্চে এবং ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জিয়াউর রহমানকে নিয়ে প্রধান স্মৃতিচারণগুলো মূলত নিচের বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়:
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও স্বাধীনতার ঘোষণা।
১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
স্মৃতি: সেই দুঃসময়ে একজন সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠে স্বাধীনতার এই ঘোষণা দিশেহারা বাঙালি জাতিকে মানসিকভাবে প্রচণ্ড সাহস জুগিয়েছিল। অনেক মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণে উঠে আসে যে, জিয়ার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
সামরিক নেতৃত্ব ও সম্মুখ সমর
জিয়াউর রহমান শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি যুদ্ধের মাঠে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: চট্টগ্রামে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
জেড ফোর্স (Z Force): মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে তিনি রৌমারী, বাহাদুরাবাদ ঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তার অধীনে থাকা যোদ্ধাদের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড এবং সাহসী কমান্ডার।
সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম) কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে তাকে ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বও দেওয়া হয়। যুদ্ধের দিনগুলোতে তার রণকৌশল এবং সহযোদ্ধাদের সাথে তার ব্যবহার নিয়ে অনেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন সময়ে স্মৃতিচারণ করেছেন।
সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে ‘মেজর জিয়া’
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘মেজর জিয়া’ হিসেবেই প্রথম পরিচিতি পান। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও, বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিতে আজও সেই ২৭শে মার্চের রেডিওর ঘোষণাটি একটি মাইলফলক হয়ে আছে।
জিয়াউর রহমানের সামরিক জীবনের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো চট্টগ্রামের কালুরঘাট প্রতিরোধ এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্সের’ (Z Force) নেতৃত্ব। নিচে তার বীরত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. চট্টগ্রামে বিদ্রোহ ও কালুরঘাট প্রতিরোধ (মার্চ ১৯৭১) ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে, তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান তার ইউনিট ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
ঘটনা: তিনি পাকিস্তানি কমান্ডিং অফিসারকে বন্দি করে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে অস্বীকার করেন।
স্মৃতি: কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র রক্ষা করতে গিয়ে তিনি এবং তার দল যে অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা চট্টগ্রামের স্থানীয় মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। তার এই সাহসী পদক্ষেপই মূলত দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করেছিল।
২. ‘জেড ফোর্স’ গঠন ও রৌমারীর যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড হিসেবে ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয় ১৭ই জুলাই, যার অধিনায়ক ছিলেন জিয়াউর রহমান।
• রণকৌশল: তার নেতৃত্বে এই ব্রিগেড দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে একের পর এক গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করে।
• রৌমারী মুক্ত রাখা: কুড়িগ্রামের রৌমারী এলাকাটি মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় মুক্তাঞ্চল ছিল। জিয়াউর রহমানের সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের কারণেই পাকিস্তানি বাহিনী এই এলাকায় কখনো প্রবেশ করতে পারেনি। এটি ছিল মুক্তিকামী মানুষের জন্য একটি বিশাল বড় শক্তির জায়গা।
৩. কামালপুর ও নকশী বিওপি আক্রমণ
জেড ফোর্সের অধীনে থাকা ব্যাটালিয়নগুলো জামালপুরের কামালপুর এবং শেরপুরের নকশী সীমান্তে অত্যন্ত ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
• স্মৃতি: এই যুদ্ধগুলো ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী। একজন কমান্ডার হিসেবে জিয়াউর রহমান সম্মুখ সমরে তার সৈন্যদের মনোবল বাড়াতে প্রায়ই সামনের সারিতে অবস্থান করতেন। তার কঠোর শৃঙ্খলাবোধ এবং রণকৌশল দেখে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর অনেক অফিসারও মুগ্ধ হয়েছিলেন।
৪. ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ড
শুরুতে ১ নম্বর সেক্টর দেখলেও, পরে তিনি ১১ নম্বর সেক্টরের (ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল অঞ্চল) দায়িত্ব নেন। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তিনি তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমানের এই সামরিক নেতৃত্ব এবং তার অধীনে থাকা ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীরত্বগাথা বাংলাদেশের বিজয় ত্বরান্বিত করতে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল
